ঘুরেফিরে কেন শামীম ওসমানেরই নাম!


Shamim-Osmanপার্বত্য শান্তিচুক্তির প্রতিবাদে ১৯৯৯ সালের ৯ জুন বিএনপি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ শুরু করে। আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি শামীম ওসমানের বিশাল ক্যাডার বাহিনী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুরের শিমরাইল এলাকায় লংমার্চের বিশাল বহরটি আটকে দেয়। শামীম ওসমানের নির্দেশে রাত ৯টা পর্যন্ত বহরটি আর সেখান থেকে এগোতে পারেনি। সেই থেকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে শামীম ওসমানের নাম। এরপর নারায়ণগঞ্জে বড় কোনো অপরাধ সংঘটিত হলেই ঘুরেফিরে শামীম ওসমানের নাম আসতে থাকে।

সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী এবি সিদ্দিক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজন অপহৃত হওয়ার পরও আলোচনায় আসে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমানের নাম। অবশ্য শামীম ওসমান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় বারবার শামীম ওসমানের নাম আলোচনায় আসার নেপথ্য কারণ। নজরুল অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের পর আসামি নূর হোসেনের ব্যক্তিগত গাড়িটিও রোববার উদ্ধার হয় সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইলে অবস্থিত জেএমএস গ্গ্নাস ফ্যাক্টরি থেকে। এই ফ্যাক্টরির মালিক শামীম ওসমানের মামাশ্বশুর জালাল আহমেদ। কাজেই এবারও শামীম ওসমান আছেন আলোচনায়।

স্থানীয়রা জানান, নারায়ণগঞ্জে ওসমান পরিবারের প্রভাব নতুন নয়। শামীম ওসমানের দাদা খানসাহেব ওসমান আলী ছিলেন তৎকালীন এমএলএ। বাবা একেএম শামসুজ্জোহা ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। শামসুজ্জোহা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সময়ে আওয়ামী লীগের এমপি ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য। শামসুজ্জোহার তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলে নাসিম ওসমান ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি হন শামীম ওসমান। আর মেজভাই সেলিম ওসমান নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স ও বিকেএমইএর বর্তমান সভাপতি। নারায়ণগঞ্জে এই পরিবারের প্রভাব বিশাল।

তবে সেই প্রভাবে কালো ছায়া নেমে আসে নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই শহরের খানপুরে মহসীন ক্লাবের সামনে রাখা নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের একটি গাড়ির কাচ কে বা কারা ভেঙে দেয়। এ ঘটনায় আজমেরী ওসমানের অনুসারীরা কয়েকজনকে ধরে নিয়ে আসে। খানপুরের দুই যুবক হীরা ও জাহাঙ্গীরের আঙুল কেটে নেয় তারা। কিছু দিন পরই নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের নেতা আলমগীর হোসেনকে শহরের জামতলায় গুলি করে হত্যা করা হয়। ছাত্রলীগের ওসমান পরিবার অংশের সঙ্গে আলমগীরের গ্রুপিংয়ের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে মনে করেন এলাকাবাসী।

২০১১ সালের ১১ মে শামীম ওসমানের লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে শহরের খানপুরের তরুণ ব্যবসায়ী আশিক ইসলামকে তার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপরই নিখোঁজ হন আশিক ইসলাম। ১৩ মে শীতলক্ষ্যা থেকে উদ্ধার হয় আশিক ইসলামের লাশ।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগ নেতা ফতুল্লার গাবতলী গ্রামের মিঠুকে। হত্যাকারীরা ওসমান পরিবারের অনুসারী বলে ব্যাপক প্রচার আছে। এলাকাবাসীর ধারণা, ফতুল্লার ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওসমান পরিবারের অনুসারীদের সঙ্গে বিরোধের কারণেই নিহত হন মিঠু।

২০১২ সালের ১৭ জুলাই রাতের বেলায় নারায়ণগঞ্জের তরুণ নাট্যকার দিদারুল আলম চঞ্চল নিখোঁজ হন। দুই দিন পর ১৯ জুলাই বন্দর উপজেলার শান্তিনগর পয়েন্টে শীতলক্ষ্যা নদে পাওয়া যায় চঞ্চলের লাশ। ওসমান পরিববারের আজ্ঞাবহ এক ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে বিরোধের জের ধরে চঞ্চল খুন হন বলে ধারণা করেন এলাকাবাসী। ওই ছাত্রলীগ নেতা এখন নারায়ণগঞ্জ ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ের পদে আছেন।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশেনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত রফিউর রাবি্বর ছেলে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী। ৮ মার্চ তার লাশ শীতলক্ষ্যা থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায়ও অভিযোগ ওঠে ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে ত্বকীর রক্তমাখা প্যান্ট-শার্ট উদ্ধার করা হয় আজমেরী ওসমানের টর্চার সেল থেকে। র‌্যাবের তদন্তেও ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আজমেরী ওসমানের জড়িত থাকার তথ্য বেরিয়ে আসে। ত্বকী নিখোঁজের পর ওই ঘটনার সঙ্গে ওসমান পরিবারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে আসছিলেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে রয়েছে অর্ধসহস্রাধিক গার্মেন্টসহ সহস্রাধিক শিল্প-কারখানা। এসব কারখানায় চলে চাঁদাবাজি। গার্মেন্টে চলে ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। এ ছাড়া আছে জমি দখল, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপকর্ম। এসব কিছুর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ওসমান পরিবারের সদস্যদের নাম। নজরুলসহ সাতজন নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেও এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের মেয়র ডা. আইভী ওসমান পরিবারের দিকে আঙুল তুলে আসছিলেন। গত রোববারও তার বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ ঘটনায় তিনি ওসমান পরিবারকে অভিযুক্ত করেন।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে শামীম ওসমান  বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের কোনো ঘটনার পরপরই আইভী আমার ও আমার পরিবারের দিকে ইঙ্গিত করে। সে একজন মিথ্যাবাদী। বারবার আমার লোকরাই গুম-খুনের শিকার হচ্ছে। এর আগে আমার কর্মী পারভেজকে হত্যা করা হয়েছে। মাকসুদ নামে আরেকজন অপহৃত হয়েছে। যারা আমার বিরুদ্ধে এসব অপবাদ ছড়ায় তারাই নারায়ণগঞ্জের এ ঘটনাকে ব্যবহার করে সরকার ও আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। এসব সত্যও যথাসময়ে বেরিয়ে আসবে।’সূত্রঃ সমকাল

(279)