নারায়ণগঞ্জ সিটির গুম ও খুনের নেপথ্যে


khunনারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের সঙ্গে ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেনের বিরোধের জেরে খুনের পর খুন হয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জে। বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডকে নানা ধরনের প্রলেপ লাগিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হলেও বেশির ভাগের নেপথ্যে ছিল এ দুজনের দ্বন্দ্ব। সিদ্ধিরগঞ্জে গত ১৭ বছর ধরেই এ পরিস্থিতি চলছে। সর্বশেষ নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনের অপহরণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডও এরই ধারাবাহিকতায় ঘটেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। নজরুল ইসলাম জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও নূর হোসেন সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, দুজনের দ্বন্দ্বের জেরে প্রথম হত্যাকাণ্ডটি হয় ১৯৯৭ সালের ১৭ জুলাই। সেদিন মাগরিবের নামাজের পর সাইফুদ্দিন মাহমুদ নামে এক ব্যক্তিকে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি চৌধুরীপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করেন নজরুলের ক্যাডাররা। সাইফুদ্দিন ঢাকায় বিদেশি একটি সংস্থার কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ‘ভুল টার্গেটে’ পরিণত হয়েছিলেন। ২০০০ সালের ২৭ আগস্ট রাতে নূর হোসেনের পোস্টার লাগাতে গেলে মিজমিজি পাইনাদী ধনু হাজী রোড এলাকায় নজরুলের উপস্থিতিতে তার ক্যাডাররা হত্যা করেন জহিরুল ইসলাম নামে এক সবজি বিক্রেতাকে। এর জের ধরে ১ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ অফিসে ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হয় নজরুলের সমর্থক যুবলীগ নেতা আবদুল মতিনকে। মামলার অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) নূর হোসেনের ক্যাডারদের নাম আসে। ১৯৯৬ সালের মার্চে শিমরাইল মোড়ে নিহত হন আওয়ামী লীগ কর্মী আলী হোসেন। সেই মামলায় নূর হোসেন ও তার লোকজন আসামি হলেও আদালত থেকে খালাস পান সবাই। নজরুলের ক্যাডার শিপন, রনি ও ফারুক ২০০১ সালের ৩১ মার্চ রাত ৯টার দিকে শিল্পী নামে এক তরুণীকে মাথায় গুলি করে হত্যা করেন। মেয়েটি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়।

২০০০ সালের ৩ মার্চ রাতে ধানমন্ডি ১৫ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বর বাড়ির সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ওই এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট বাবর এলাহী। মামলাটি সিআইডির তৎকালীন এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান তদন্ত করেন। তিনি সরকারের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন ও তার সহযোগী নজরুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০০৩ সালের ১৪ জুলাই অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, নজরুল পাঁচ লাখ টাকার চুক্তিতে অন্যদের নিয়ে বাবর এলাহীকে হত্যা করেন। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০০৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি টিটন ও নজরুলের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। রায়ের খবর জানার পর নজরুল দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। হাইকোর্ট ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুজনকেই খালাস দেন। মিজমিজি পূর্বপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে ২০০৯ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশ চুন প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সহ-সভাপতি আবু তালেব। আদালতে পুলিশের অভিযোগপত্রে আসামিদের নজরুলের ক্যাডার বলে চিহ্নিত করা হয়।

নূর হোসেন ও বাহিনীর সদস্যদের গা ঢাকা : প্যানেল মেয়র ও দুই নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ কয়েকজনকে অপহরণ-হত্যার ঘটনায় মামলার পর থেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন এলাকায় গডফাদার হিসেবে পরিচিত নূর হোসেন। তার সহযোগীরাও লাপাত্তা। সোমবার গভীর রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল টেকপাড়া এলাকায় নূর হোসেনের বাসভবন ও শিমরাইল মোড় ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকায় অফিসে অভিযান চালায় পুলিশ। কিন্তু এর আগেই তিনি পালিয়ে যান। ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আক্তার হোসেন জানান, সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে তার নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। ওসি বলেন, ‘নূর হোসেন তার অফিসে অবস্থান করছেন, এমন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা সেখানে যাই। তবে তাকে পাওয়া যায়নি।’ জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক (ডিআইও-১) জানান, এজাহারনামীয় আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে। প্রসঙ্গত, সোমবার রাত ৯টার দিকে ছয়জনের নামোল্লেখ ও পাঁচ-ছয়জনকে অজ্ঞাত আসামি করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম। আসামিরা হলেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নূর হোসেন, সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন মিয়া, ইকবাল, হাসু, রাজু ও আনোয়ার। এর মধ্যে হাসু নজরুলের চাচাশ্বশুর বলে জানা গেছে। নূর হোসেন ও হাজী ইয়াসিন যে কোনো সময় দেশত্যাগ করতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সেলিনা ইসলাম।সূত্রঃ বিডি-প্রতিদিন

(209)