মন্ত্রীর ছেলের মধ্যস্থতায় নজরুল খুনের চুক্তি


nazrulনারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডারের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি দলের এক মন্ত্রীর ছেলের মধ্যস্থতায় প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। আলোচিত এ হত্যাকা-ের নেপথ্য হোতা নূর হোসেনের সঙ্গে ওই মন্ত্রীপুত্রের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব রয়েছে। সে সূত্রেই মন্ত্রীর জামাতা র‌্যাব ১১-এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদের সঙ্গে নূর হোসেনের যোগাযোগ হয়। টাকা লেনদেন হয় সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল ও রাজধানীর রায়েরবাগের দু’টি বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে। হাতে হাতেও পৌঁছানো হয়েছে মোট টাকার একটি অংশ। গতকাল নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের নিচতলার নামাজঘরে বসে এসব তথ্য জানান নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম ওরফে শহীদ চেয়ারম্যান।

এদিকে আলোচিত এই হত্যাকা-ের সঙ্গে র‌্যাব ১১-এর কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর মামলার তদন্তেও নতুন মোড় নিয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা হত্যাকা-ের সঙ্গে র‌্যাবের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। এজন্য তারা ঘটনার দিন আদালত প্রাঙ্গণে নজরুলকে অনুসরণকারী যে র‌্যাব সদস্যকে আটক করা হয়েছিল তার বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। একই সঙ্গে উদ্ধারকৃত লাশের সঙ্গে বাঁধা ইটের খোঁজ করা হচ্ছে। অপরদিকে সেভেন মার্ডার মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ১৬ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও কয়েকজন হত্যাকা-ে নূর হোসেন চেয়ারম্যানের হাত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন।
পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক গোলাম ফারুক বলেন, মামলার এজাহারে যে অভিযোগ রয়েছে এর পাশাপাশি বাদী ও তাদের স্বজনরা যেসব অভিযোগ করছেন সবই গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। র‌্যাবের সম্পৃক্ততা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, র‌্যাবের বিষয়টি র‌্যাব ও হাইকোর্টের নির্দেশে পৃথক তদন্ত হচ্ছে। একাধিক মোটিভ সামনে রেখে তদন্ত কাজ চলছে।

গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালের নিচতলার নামাজঘরে বসে প্যানেল মেয়র নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম বলেন, তার জামাতা নজরুলসহ সাতজনকে তুলে নিয়ে যায় র‌্যাব। ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে খুনের চুক্তি হয়। র‌্যাবের সঙ্গে এ চুক্তি করে নূর হোসেন। তাদের মধ্যস্থতা করে দেয় চাঁদপুরে জেলার এক মন্ত্রীর ছেলে। নূর হোসেন চেয়ারম্যানের সঙ্গে সড়ক ও জনপথের কাজ একসঙ্গে করতেন মন্ত্রীপুত্র। এছাড়া তার একটি ফিলিং স্টেশন দেখাশোনা করতো নূর হোসেন। সম্প্রতি তারা ঢাকা-চিটাগাং চার লেন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের একটি অংশের উপকরণ সরবরাহের কাজ যৌথভাবে করছিল। মন্ত্রীপুত্রের মাধ্যমেই র‌্যাব ১১-এর অধিনায়কের (সিইও) সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে নূর হোসেনের। এর পরই সে র‌্যাবের অধিনায়ককে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে। খুনের টাকা একটি ব্যাংকের শিমরাইলের শাখা ও অপর একটি ব্যাংকের রায়েরবাগের শাখার মাধ্যমে লেনদেন হয়। নূর হোসেনের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করে হাসমত আলী হাসু। হাসমত অ্যান্ড ব্রাদার্স,  জসিম অ্যান্ড ব্রাদার্স, আমান, শাহজালাল, সুফিয়ান মিলে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেয়। তিনি বলেন, নূর হোসেন এর আগে পাঁচ বার নজরুলকেহত্যার চেষ্টা করেছে। পাঁচ পাঁচবার পেরে না ওঠায় এবার র‌্যাব বাহিনী দিয়ে তাকে তুলে নিয়ে হত্যা করেছে।

শহীদুল ইসলাম বলেন, পুলিশ তার বক্তব্য নিয়েছে। পুলিশকেও তিনি এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, শুধু নূর হোসেনের সঙ্গেই মন্ত্রীপুত্রের সখ্য নয়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আলোচিত ঠিকাদার আবু সুফিয়ানের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তার। মেয়র আইভীর ঘনিষ্ঠ আবু সুফিয়ানও তার জামাতাকে হত্যা করতে টাকার যোগান দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শহীদুল ইসলাম বলেন, আমার জামাইকে এভাবে মেরে ফেললো- এখন আর এসব গোপন করে লাভ কি? আমার জীবনের ওপর অনেক হুমকি আসছে। তবুও আমি সত্য বলে যাবো। শেষ বয়সে আমার যদি ফাঁসি হয় হোক। তবু আমি বলবো। আমি কোন দল বুঝি না। আমি শুধু আমার জামাইসহ সাতজনকে হত্যার জন্য দায়ীদের শাস্তি চাই। তাদের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শাস্তি চাই। এসব তথ্য তিনি কোথায় পেয়েছেন জানতে চাইলে শহীদ চেয়ারম্যান বলেন, নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমেই আমি এসব জেনেছি। নূর হোসেনের ব্যবসায়িক অংশীদার জসিমের সঙ্গে আমার যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া নূর হোসেনের সঙ্গের কয়েকজন তাকে এসব তথ্য দিয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম বলা যাচ্ছে না।

নজরুলের শ্বশুরের দাবি অনুযায়ী, খুনের ছয় কোটি টাকার যোগানদাতা নূর হোসেন চেয়ারম্যান ছাড়াও ঠিকাদার আবু সুফিয়ান, নূর হোসেনের ভাইপো ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহজালাল বাদল, বিএনপি নেতা ও ২নং ওয়ার্ডে নজরুলের সঙ্গে নির্বাচনে পরাজিত ইকবাল হোসেন এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু এবং বিএনপি নেতা হাসমত আলী হাসু। শহীদুলের দাবি, তারা সবাই সাতজনকে খুন করতে বিভিন্ন অঙ্কের টাকার যোগান দেয়। তিনি তাদের ব্যাংক একাউন্টগুলো খতিয়ে দেখার দাবি জানান।

শহীদ চেয়ারম্যান বলেন, হাসমত আলী হাসু তার আপন ছোট ভাই। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সে নজরুলের বিরোধিতা করায় নজরুলের সঙ্গে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। এ কারণে হাসু নূর হোসেন ও ইকবালের সঙ্গে মিলে নজরুলকে হত্যার পরিকল্পনা করে ও টাকার যোগান দেয়। হাসুর সাম্প্রতিক ব্যাংক লেনদেনের বিষয়টি তদন্ত করলেও তার বক্তব্যের সত্যতা মিলবে বলেও জানান শহীদুল ইসলাম। এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তারা নজরুল ও চন্দন সরকারসহ সাতজন গুম হওয়া থেকে শুরু করে লাশ উদ্ধারের পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন। গুম হওয়ার আগের জজকোর্ট এলাকায় কারা নজরুলকে অনুসরণ করেছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নূর হোসেনসহ মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা চলছে। এদের কাউকে গ্রেপ্তার করা গেলে রহস্যের জট কিছুটা হলেও খুলবে। পুলিশ সূত্র জানায়, নূর হোসেনকে গ্রেপ্তারের জন্য ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় অভিযান চালানো হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পরপরই তারা নূর হোসেনের মোবাইল ফোনের সিডিআর এনালাইসিস করছেন। এতে দেখা গেছে  ঘটনার পর নূর হোসেন অন্তত শতাধিক লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এসবের মধ্যে কয়েকটি কথোপকথন নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তবে চতুর হওয়ায় একাধিক মোবাইল ও একাধিক নম্বর ব্যবহার করেছেন। তবে লাশ উদ্ধারের আগের রাত থেকে তার আর কোন কল রেকর্ড পাওয়া যায়নি। নূর হোসেন দেশে আছে না বিদেশে চলে গেছে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, নূর হোসেন বিদেশে চলে গেছে এটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তদন্তে অগ্রগতি হচ্ছে। নূর হোসেনকে ধরার জন্য নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।সূত্রঃ মানবজমিন

(266)