স্বর্ণের এত চালান!


gold_updateবিমানের টয়লেট, যাত্রীর জুতা, মানিব্যাগ, লাগেজ, হ্যাঙ্গারগেট, বোর্ডিং ব্রিজ, ফুলদানি- কোথায় নেই চোরাচালানকৃত স্বর্ণের বার। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশিকালে মিলছে শত শত পিস স্বর্ণের বার (বিস্কুট)। টহল পুলিশের তল্লাশিতে দামি গাড়িতেও পাওয়া যাচ্ছে চোরাচালানকৃত স্বর্ণ। সীমান্ত এলাকায়ও ধরা পড়ছে স্বর্ণের চালান। সর্বত্র যেন চোরাচালানকৃত স্বর্ণের ছড়াছড়ি।

হযরত শাহজালাল ও শাহ আমানত বিমানবন্দরে ধরা পড়ছে সবচেয়ে বেশি চালান। গত এক মাসে ঢাকায় ধরা পড়েছে অন্তত দেড়শ’ কেজি স্বর্ণের চালান। গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৭০০ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এত স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড।

সর্বশেষ গতকাল শনিবার শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের টয়লেট থেকে ১০৫ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এটি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় বৃহত্তম চোরাচালানকৃত স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা।

এর আগে গত বছরের ২৪ জুলাই ঢাকা বিমানবন্দরে কাঠমান্ডুফেরত বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজের কার্গো চেম্বারে বিশেষভাবে রাখা অবস্থায় ১২৪ কেজি স্বর্ণের চালান ধরা পড়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটি ধরা পড়া সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বর্ণের চালান। তবে এই চালানের সঙ্গে কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় আজও জানা যায়নি, কারা এই স্বর্ণ নিয়ে আসছিলেন? এর গন্তব্যই বা কোথায় ছিল?

চলতি বছর শুধু চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে ১৮৮ কেজি ৬৫ গ্রাম ওজনের এক হাজার ৬২৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছে, যার মূল্য ৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধভাবে যে সংখ্যক স্বর্ণের চালান বাংলাদেশে ঢুকছে, তার অধিকাংশই ধরা পড়ছে না। আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিরা

বাংলাদেশকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের দাবি, বাংলাদেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ স্বর্ণের চাহিদা রয়েছে, তার কয়েকগুণ বেশি চোরাচালানকৃত স্বর্ণ দেশে ঢুকছে। বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে এসব স্বর্ণ পাশের কয়েকটি দেশেও চলে যাচ্ছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক মইনুল খান সমকালকে বলেন, স্বর্ণ ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক। প্রতি ভরিতে ১৮ হাজার টাকা লাভ হয়। স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে মানি লন্ডারিংসহ অনেক কিছু জড়িত। ভারতে স্বর্ণ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ হয়ে স্বর্ণের চালান ভারতে যাওয়ার এটিও একটি কারণ। এ ছাড়া বিমানবন্দরসহ অনেক এলাকায় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশি তৎপর হওয়ায় উদ্ধারের পরিমাণ বাড়ছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ সমকালকে বলেন, সম্প্রতি স্বর্ণ চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক বাড়ানো হয়েছে। প্রায়ই সীমান্তে চোরাচালানকৃত স্বর্ণ ধরা পড়ছে।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সভাপতি ডা. দিলীপ রায় সমকালকে বলেন, স্বর্ণ চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এই চক্র হেরোইন ও অন্যান্য দামি সামগ্রীও চোরাপথে আনছে। এতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। চোরাকারবারি যে-ই হোক, তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতিদিন স্বর্ণের চাহিদা দুই হাজার ৫০০ ভরি। প্রতি ভরি ৪০ হাজার টাকা ধরে এ পরিমাণ স্বর্ণের দাম প্রায় ১০ কোটি টাকা।

তবে প্রতিদিন দেশে এর কয়েকগুণ বেশি চোরাপথে স্বর্ণ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। আর বেশিরভাগ স্বর্ণ দেশের বাইরে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চোরাচালানকৃত স্বর্ণ দুবাই থেকে বাংলাদেশে আসছে। কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, গত পাঁচ বছরে দেশে এক ভরি স্বর্ণ বাণিজ্যিকভাবে বৈধপথে আসেনি। আর চোরাচালানকৃত স্বর্ণ আটকের অধিকাংশ ঘটনায় মামলা না হওয়ায় জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেক মামলার আসামিরা জামিনে ছাড়া পাচ্ছে।

স্বর্ণ আনার নিয়ম: কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যাত্রী হিসেবে দু’ভাবে দেশে স্বর্ণ আনতে পারেন। প্রথমত, স্বর্ণের বার বা বিস্কুট আনতে পারেন। এ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দুই কেজি স্বর্ণ কোনো যাত্রী দেশে আসার সময় সঙ্গে আনতে পারেন। এতে ২০০ গ্রাম (১৭ দশমিক ১৪ ভরি) পর্যন্ত প্রতি ভরি ১৫০ টাকা ট্যাক্স দিতে হয়। বাকি স্বর্ণের জন্য দামের ওপর ৪ শতাংশ ট্যাক্স পরিশোধ করার বিধান আছে। এ ছাড়া গহনা হিসেবে কোনো যাত্রী ২০০ গ্রাম পর্যন্ত স্বর্ণ ট্যাক্স ফ্রিতে আনতে পারেন। এর বেশি পরিমাণ স্বর্ণ আনলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

এমনকি এলসি খুলে বাণিজ্যিক চ্যানেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে স্বর্ণ আনার নিয়ম আছে। এ পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল। এতে স্বর্ণের দামের ওপর ৪ শতাংশ হারে ট্যাক্স দিতে হয়। পাশাপাশি প্রতি ভরি জন্য ১৫০ টাকা পরিশোধ করার বিধান আছে। এ পদ্ধতিতে ৪০ হাজার টাকা ভরিতে স্বর্ণ আনা হলে সরকারকে চার হাজার ১৫০ টাকা বাড়তি দিতে হয়। ভারতে প্রতি ভরিতে চার হাজার টাকা ট্যাক্স দিতে হয়।

এক মাসে দেড়শ’ কেজির বেশি চোরাচালানকৃত স্বর্ণ আটক :গত এক মাসে রাজধানীতে অন্তত দেড়শ’ কেজি চোরাপথে আনা স্বর্ণের চালান উদ্ধার করা হয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুক্রবার বাহার নামের এক যুবকের জুতার ভেতর থেকে ২৮টি স্বর্ণের বার পাওয়া যায়। উদ্ধার করা বারের ওজন তিন কেজি ২৬ গ্রাম। এর আগে গত সোমবার সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের দুই নারী যাত্রীর কাছ থেকে ২০ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। পরদিন মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের নারী যাত্রী আমেনার কাছ থেকে এক কেজি স্বর্ণ পাওয়া যায়।

এর আগে ১৪ এপ্রিল রাজধানীর গাবতলীতে মাজার রোডের উল্টো পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। অপরিচ্ছন্ন প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা ওই ব্যক্তির কাছে থাকা প্লাস্টিকের হাতব্যাগ তল্লাশি করে পুলিশ ১৫০টি স্বর্ণের বার পায়, যার ওজন ১৭ কেজি ৪৪১ গ্রাম। সম্প্রতি রাজধানীর রামপুরা থানা পুলিশ চোরাকারবারিদের গাড়ি তল্লাশি করে প্রথমে আট কেজি ওজনের ১৪৯টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে।

পরে ওই স্বর্ণের একটি বড় অংশ পুলিশের কয়েক সদস্য গায়েব করে দিলেও ডিবি পুলিশ তা উদ্ধার করে। উদ্ধার করা ওই স্বর্ণের ওজন ছিল ১৮ কেজি। ওই ঘটনায় পুলিশের তিন সদস্যকে গ্রেফতারও করা হয়। তারা বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন। এর আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে চেকপোস্টে গাড়ি তল্লাশি করে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের ১০০ স্বর্ণের বার পাওয়া যায়।

জামিন পাচ্ছেন অনেকে: গত বছরের মার্চ থেকে নভেম্বরে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের ২০টি ঘটনার আসামিদের জামিনে ছাড়া পাওয়ার তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। স্বর্ণ উদ্ধারের মামলায় দীপক কুমার, সাড়ে পাঁচ কেজি স্বর্ণের মামলায় মো. হাবিব, সাড়ে ছয় কেজি স্বর্ণের মামলায় দেলোয়ার, এক ও দুই কেজি স্বর্ণের মামলায় আতিকুল ইসলাম, মনোয়ার, আবদুর রউফ, রব্বানী, মিজানুর রহমান, রাজেশ, আসাদুল্লাহ, কামাল উদ্দিন ও আবুল কাশেমরা জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছে।

গত বছরের ২৪ জুলাই ঢাকা বিমানবন্দরে কাঠমান্ডুফেরত বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজের কার্গো চেম্বারে বিশেষভাবে রাখা অবস্থায় ১২৪ কেজি স্বর্ণের চালান ধরা পড়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই ধরা পড়া সর্বোচ্চ পরিমাণ স্বর্ণের চালান। সিঙ্গাপুর, দোহা, হংকংয়ের এ পাচারকারী চক্রের লোকজন অবস্থান করে।

তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে: চোরাচালানকৃত স্বর্ণ নিয়মিত বাংলাদেশে ঢুকলেও এর অধিকাংশ থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ৯০ শতাংশ ঘটনায় বাহকরা ধরা পড়ছে। রাঘববোয়ালের টিকিটিও স্পর্শ করা সম্ভব হচ্ছে না। রামপুরা থানা পুলিশ চোরাকারবারিদের গাড়ি তল্লাশি করে স্বর্ণ ও ভারতীয় নাগরিক সমীরসহ দু’জনকে গ্রেফতার করলেও তাদের ‘গুরু’কে এখনও শনাক্ত করতে পারেনি। এমনকি গাবতলীতে চোরাচালানকৃত স্বর্ণসহ বাহককে গ্রেফতার করা সম্ভব হলেও মালিককে শনাক্ত করা

যায়নি। সীমান্তের বেনাপোল, সোনামসজিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আখাউড়া ও হিলি দিয়ে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ চোরাচালান হয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতে স্বর্ণ পাচার করতে নেপাল ও শ্রীলংকাকেও ট্রানজিট রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে চোরাকারবারিরা। গত বছরের মাঝামাঝিতে স্বর্ণ আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে ভারত সরকার। এর পর আগস্ট মাস থেকে দেশটিতে স্বর্ণ আমদানি ৯৫ শতাংশে কমে আসে। তা ছাড়া স্বর্ণ আমদানিতে শুল্ক হার ৬ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়।

এতে স্বর্ণ আমদানিতে আরও ধস নামে। গত বছর রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৪০ ভরি চোরাচালানকৃত স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত বিমানবন্দরের জুনিয়র নিরাপত্তা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বিপু, ক্লিনিং সুপারভাইজার আবু জাফরসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।

এর আগে একাধিক সময় স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য আটক হন। বিমানবন্দরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ছয়-সাতটি ইউনিট কাজ করায় চোরাকারবারি গ্রেফতারে তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতাও চলছে।সূত্রঃ সমকাল

(117)