হিট স্ট্রোক এড়াতে করণীয়


hot_morningsunbdগত কয়েকদিন ধরেই প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কবলে দেশ। হাঁসফাঁস করছে মানুষ। ত্রাহি অবস্থা প্রাণিকূলেরও। তাপমাত্রা বাড়ছে ক্রমেই। বৃষ্টিরও দেখা নেই। চরমভাবাপন্ন এই আবহাওয়া সার্বিকভাবে দুঃসহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

বৈশাখে গরমের সঙ্গে বৃষ্টিও হয়। কিন্তু এবার বৃষ্টির দেখা নেই। বৈশাখে গরম পড়ে ঠিকই, কিন্তু এ বারের গরমটা অন্যরকম। ঘাম বের হচ্ছে না। মুল সমস্যাটা কিন্তু এখানেই।

চিকিৎসকরা বলেন,  ঘাম যতই বিরক্তিকর হোক, আসলে এই ঘামই শরীরকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। ত্বককে রাখে আর্দ্র। কিন্তু এবারের গরম থেকে সেই ঘাম উধাও।

এ দিকে বাইরের তাপমাত্রাও বাড়ছে ক্রমশ। সতর্কতা অবলম্বন না করলে এই ধরনের আবহাওয়ায় হিট স্ট্রোক হতে পারে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সেই আশঙ্কা করে বলেছেন, আসলে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস মানুষের শরীরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাইরের পরিবেশের তাপমাত্রা যদি খুব বেশি হয়ে যায়, আর তা যদি মস্তিষ্কের তাপনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তখনই যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন হিট স্ট্রোকে।

এ ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন ডা. সুব্রত মৈত্র ও পার্থসারথি মুখোপধ্যায়। পরামর্শটি আমার আনন্দবাজার অনলাইন থেকে রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

হিট স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ে কখন

বাইরের তাপমাত্রা খুব বেশি, অথচ কোনো রকম সাবধানতা ছাড়াই চড়া রোদে দীর্ঘ সময় কেউ অবস্থান করলে হিট স্ট্রোকে আক্রান্তের সম্ভাবনা বেশি থাকে। দীর্ঘক্ষণ পানি পান না করলে শরীরে পানির পরিমাণ কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে  ডিহাইড্রেশন হয়। ডিহাইড্রেশন হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। চলাফেরায় শক্তি হারিয়ে ফেলে। গরমে বেশি বেশি পানি পান করতে হবে যেন কোনো অবস্থাতেই ডিহাইড্রেশন না হয়।

গরমে এমন পোশাক পরা উচিত নয় যা দিয়ে স্বাভাবিক বায়ুচলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। শরীর থেকে ঘাম বেরুতে না পারলে অস্বস্তি আরো বাড়বে। প্রচণ্ড গরমে ঢিলেঢালা হালকা পাতলা পোশাকই পরা উচিত। মেয়েদের ক্ষেত্রেও তাই প্রয়োজন।

সমস্যাটা কী হয়

প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মানুষ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। মারাত্মক রকম হলে রোগী চলে যেতে পারেন কোমায়ও। শেষে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে যায়। হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা কম নয়। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা খুব জরুরি। বিশেষ করে চলমান দাবদাহে তো বটেই।

চিকিৎসকদের মতে, হিট স্ট্রোক হয় অসহনীয় তাপ আর গরমে। মানুষের শরীরের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা খুব বেশি বেড়ে যায়। রক্তে পানির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যমাত্রায় কমে যায়। পানির পরিমাণ খুব বেশি কমে গেলে কিডনিরও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

প্রচণ্ড গরমে শরীরে সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের মাত্রা হঠাৎ করেই খুব বেশি অথবা কমে যেতে পারে। তার থেকে কখনো কখনো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকেই হিট স্ট্রোক বলে।

হিট স্ট্রোক হলে কী করবেন

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ-কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছে এমনটা অনুধাবন করা সম্ভব হলে রোগীকে প্রথমেই ঠাণ্ডা শীতল স্থানে বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিতে হবে।  পারলে ঠাণ্ডা পানি চোখেমুখে দিতে হবে। ফ্যানের নিচেও রাখা যেতে পারে। অন্ততপক্ষে হাতপাখার বাতাস দেওয়া যেতে পারে। ঠান্ডা পানি দিয়ে রোগীর গা মুছে দিলে রোগী দ্রুত জ্ঞান ফিরে পাবেন। পানি খাওয়ানো গেলে তাও দিতে হবে। আস্তে আস্তে রোগী স্বাভাবিক হয়ে যাবেন। আর যদি দেখা যায়, এতেও রোগীর উন্নতি হচ্ছে না, তবে বিলম্ব না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে ভর্তি করাতে হবে।

হিট স্ট্রোক এড়াতে করণীয়

বাইরে বেরুলেই ছাতা আর সানগ্লাস ব্যবহার করা উচিত। সঙ্গে পানি রাখতে হবে বোতলে । লবন লেবু মেশানো পানিও অল্প অল্প করে বার বার খেতে পারেন। আর অবশ্যই সুতির জামাকাপড় পরতে হবে।

এসি থেকে বাইরের গরমে বেরোলে তাপমাত্রার হেরফের হওয়ায় অনেকের ঠান্ডা লেগে যায়। আসলে একটানা এসিতে থাকলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বার বার ঠান্ডা-গরম করলে সেই তাপমাত্রার পরিবর্তন শরীর নিতে পারে না। যার থেকে চট করে ঠান্ডা লেগে যায়। তবে এসি সহ্য করতে পারেন না, অথচ সাত-আট ঘন্টা এসিতে কাজ করতে হলে গলায় গরম কাপড় ব্যবহার করবেন।

গরমে পেটের সমস্যা

গরমে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও সাবধানতা দরকার। কারণ গরমে খাবার থেকেই অনেকে পেটের সমস্যায় ভোগেন। এই প্রসঙ্গে  চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো- গরমের সময় খাবার তাড়াতাড়ি পচে যায়। খাবারে বিষক্রিয়া হয়। সেই খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হতে পারে। যার থেকে বমি, লুজ মোশন শুরু হয়ে যায়। যদি পানি কম খাওয়া হয় বা  ঘাম বেশি হয়, আর তার সঙ্গে লুজ মোশন চলতে থাকে, তবে তার থেকে সমস্যা অনেকটাই বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে ব্লাড প্রেশার নেমে যেতে পারে। কিডনিতে পানি সরবরাহ কমে গিয়ে কিডনির সমস্যাও তৈরি হতে পারে। তাই টাটকা খাবার খাওয়া জরুরি। রাস্তা ও রেস্তোরাঁর খাবার এড়িয়ে চলুন। বাড়িতে তৈরি হাল্কা ও সহজপাচ্য খাবার খেতে পারলেই ভাল।

গরমে রাস্তায় বেরিয়ে আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয়, বরফ গোলাসহ রকমারি শরবতের হাতছানি অনেক সময় এড়ানো যায় না। মুশকিল হল এগুলো থেকে অনেক সময় জন্ডিস (হেপাটাইসিস), গ্যাসট্রোএন্ট্রাইটিস হতে পারে। কারণটা হল পানি। যে পানি দিয়ে এগুলো বানানো হয়, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পরিশুদ্ধ পানীয় জল নয়। কাটা ফলের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে। রাস্তায় ফল কেটে অনেকক্ষণ রেখে দিলে বা ফল যদি ঠিক মতো পানি দিয়ে না ধোওয়া হয়, তবে উপকারের থেকে অপকার অনেক বেশিই হয়। তাই সব সময় বাড়ির পানি খাওয়া উচিৎ।

এ প্রসঙ্গে  পরামর্শ হলো, গরমে পেটের সমস্যা এড়াতে ফোটানো পানি পান বুদ্ধিমানের কাজ হবে। রাস্তায় বেরুলে মিনারেল ওয়াটার পান করতে পারেন। ডাবের পানি নিরাপদ ও বেশ উপকারী। কিন্তু কিডনির সমস্যা থাকলে ডাবের পানি এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ ডাবের পানিতে খুব বেশি পরিমাণ পটাশিয়াম থাকে।

(155)